'ভূতের ভবিষ্যৎ' খ্যাত প্রখ্যাত নির্মাতা অনীক দত্তের আকস্মিক প্রয়াণ, মৃত্যু ঘিরে ঘনীভূত রহস্য


টলিউডের আকাশে ফের শোকের কালো মেঘ। কলকাতার হিন্দুস্তান পার্কে বাসভবনের ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মর্মান্তিক মৃত্যু হলো 'ভূতের ভবিষ্যৎ' খ্যাত প্রথিতযশা চলচ্চিত্র পরিচালক অনীক দত্তের (৬৬)। বুধবার (২৭ মে) দুপুরে ঘটা এই আকস্মিক ঘটনায় সমগ্র চলচ্চিত্র অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ঘটনার বিবরণ ও তদন্ত:

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বুধবার দুপুরে হিন্দুস্তান পার্কের বহুতল ভবনের চারতলার ছাদ থেকে নিচে পড়ে যান অনীক দত্ত। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে দ্রুত ঢাকুরিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

ঘটনার খবর পেয়েই কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখা এবং গড়িয়াহাট থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের সূত্রমতে, পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাস্থল থেকে একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করা হয়েছে, যেখানে লেখা রয়েছে— "আমার মৃত্যুর জন্য আমি ছাড়া অন্য কেউ দায়ী নয়।" পুলিশ নোটটির হস্তাক্ষর যাচাই করছে। ঘনিষ্ঠ সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে, প্রখ্যাত এই নির্মাতা দীর্ঘদিন ধরে শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক সমস্যা এবং গভীর বিষণ্ণতায় ভুগছিলেন।

পরিবার ও শেষকৃত্য:

গত কয়েক মাস ধরে তিনি একাই বসবাস করছিলেন বলে জানা গেছে। তাঁর মেয়ে ঐশী বর্তমানে কর্মসূত্রে বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি বুধবার রাতেই কলকাতায় পৌঁছাবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান জানিয়েছেন, মেয়ের উপস্থিতির পর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বৃহস্পতিবার এসএসকেএম (SSKM) হাসপাতালে মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে।

চলচ্চিত্রাঙ্গনে অনবদ্য অবদান:

২০১২ সালে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ নির্মাণের মধ্য দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে এক নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন অনীক দত্ত। ভৌতিক আবহের আড়ালে সমাজ ও রাজনীতির প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ শ্লেষ এবং বুদ্ধিদীপ্ত রসবোধ দর্শক ও সমালোচকদের কাছে দারুণ প্রশংসিত হয়, যা আজও বাংলা চলচ্চিত্রে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। এরপর ‘আশ্চর্য প্রদীপ’, ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’ এবং ‘বরুণবাবুর বন্ধু’-এর মতো মননশীল সিনেমা উপহার দিয়েছেন তিনি।

সত্যজিৎ রায়ের জীবনী অবলম্বনে তাঁর নির্মিত ‘অপরাজিত’ সিনেমাটি জাতীয় পুরস্কার অর্জন করার পাশাপাশি বক্স অফিসেও তুমুল সাফল্য লাভ করে। ২০২৫ সালের দুর্গাপূজায় মুক্তি পেয়েছিল তাঁর সর্বশেষ সিনেমা ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’। মৃত্যুকালে তিনি ‘অপরাজিত ২’-এর কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন।

শোকস্তব্ধ টলিপাড়া:

মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতালে ছুটে যান নির্মাতা সৃজিত মুখার্জি, অভিনেতা জিতু কমল, সুরকার দেবজ্যোতি মিশ্রসহ টলিউডের বহু তারকা ও সহকর্মী। মূলধারার বাইরে গিয়ে সামাজিক পর্যবেক্ষণ ও বুদ্ধিদীপ্ত গল্পের রূপকার হিসেবে অনীক দত্তের এই অকাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিদায় বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য নিঃসন্দেহে এক অপূরণীয় ক্ষতি।